'নিখিল বিশ্ব পাখিসব ' বার্তা বিভাগের আজকে দম ফেলার ফুসরত নেই । উত্তেজনাকর এক পরিস্থিতি নাকি তৈরী হয়েছে কোন সীমান্তে ।
বার্তা বিভাগের নির্বাহী পরিষদের তাই সভা বসেছে । নির্বাহী সভাপতি বাজপাখি, সম্পাদক উটপাখি, সদস্য সচিব সি-গাল , সিনিয়র রিপোর্টার কুইটজেল , জুনিয়র রিপোর্টার কিংফিশার সবাই উপস্থিত । টেলিফোনে একের পর এক সংবাদ আসছে ।
বাজপাখি গম্ভীর ভঙ্গিতে পাখাটা মুড়িয়ে বসে বলে, প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ, বিশ্বের আপামর পাখিসমাজকে এই সংকট সম্পর্কে ঠিকভাবে অবহিত করা, তা হলো আমাদের.. ঐ যাকে বলে দায়িত্ব, তাই । আপনারা অবগত আছেন যে, পশ্চিম সীমান্তে..
পাশ থেকে উটপাখি গলা বাড়িয়ে ফিসফিস করে বলে, পূর্ব সীমান্ত স্যার ।
বাজপাখি চোখ পিটপিট করে ,
ঐ হলো গিয়ে, হু হু, পূর্ব সীমান্তেই, শালিক আর শ্যাজান পাখির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে । দুঃখের বিষয় হলো, শ্যাজানপক্ষ বেশ চড়াও হয়ে শালিকদের ওপর নিপীড়ন করছে বলে আপাতত জানা গেছে । এমনকি শালিকদের বসতগুলোও দখলে নিয়েছে বলে আমরা খবর পেয়েছি । অসহায় শালিকদের ওপর শ্যাজানদের এই অপ্রত্যাশিত আগ্রাসন নিয়ে আমরা আমাদের সংবাদ মাধ্যমে বস্তনিষ্ঠ খবর প্রকাশ করব । বিশ্বের পাখিসমাজকে সত্যটি জানিয়ে দেব অকাতরে । তো, ঐ যাকে বলে, হুঁ, চলুন শিরোনামগুলো ঠিক করা যাক ।
বাজপাখি আরামকেদারায় হেলান দেয় । দরজা দিয়ে হার্মিংবার্ড ঢোকে ।
জনাব বাজমহাশয়, মহামান্য ঈগল আপনাদের বার্তা বিভাগে সামান্য উপহার পাঠিয়েছেন ।
বাজপাখি তড়াক করে উঠে পড়ে ।
খাবি খাওয়া গলায় বলে, আমার, আমার জন্য?
হার্মিং বার্ড চোখ টিপে বলে,
জি বাজমহাশয়, তারপর উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলে, আপনাদের সবার জন্যও বিশাল বোনাস ঘোষণা হবে । আমাদের পাখবতাবাদী মহামান্য ঈগল আপনাদের মহৎ কাজকে সম্মানিত করবেন । তবে...
হার্মিং বার্ড সভাপতির দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে বলে, জানেনই তো, আমাদের মহামান্য ঈগলের অত্যন্ত আস্থাভাজন, সম্মানিত শ্যাজানরা আজ এক সংকটের মুখোমুখি । মহা দুষ্কৃতিকারী শালিকরা তাদের অযৌক্তিক দাবি নিয়ে শ্যাজানদের শান্তি শৃঙ্খলায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে । এবং অত্যন্ত হাস্যকরভাবে কিছু এলাকা নিজেদের বলে দাবী করছে । এই সংকটে শ্যাজানদের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, পাখবতার পক্ষে- সচেতন পাখিনাগরিক হিসেবে আপনাদের বলিষ্ঠ প্রচার মহামান্য ঈগল প্রত্যাশা করেন ।
সভাপতি বাজপাখি বলে ,
বস্তুত শ্যাজানদের ওপর শালিকদের এই হামলা বিশৃঙ্খলা নিয়েই আমাদের কথা হচ্ছিল । আমরা আমাদের বস্তনিষ্ঠ প্রচার ও সংবাদ দিয়ে শালিকদের দুষ্কৃতিপনা আর শ্যাজানদের শান্তির প্রতি শ্রদ্ধা কে বিশ্বের নিখিল পাখিসমাজের কাছে তুলে ধরব । মহামান্য ঈগলকে আপনি আশ্বস্ত করতে পারেন ।
শুধু, একটা কথা আরকি.... বাজপাখি গলা নামিয়ে হার্মিংবার্ডের কানে কানে বলে,
এনুয়্যাল ডোনেশনের পরিমাণটা খানিকটা বাড়ানো যায় কি না, মহামান্য ঈগলকে একবার বলে দেখে, বোঝেনই তো, আজকাল মন্দা চলছে, তা একটা ডোনেশন, ধরুন যদি...
হার্মিং বার্ড বাজকে থামিয়ে বলে, ওসব নিয়ে আর কিছু বলতে হবে না বাজমহাশয় । যথাসময়ে পেয়ে যাবেন । আপনি শুধু এদিকটা, মানে দেখবেন আর কি, সব ঠিকঠাক যদি-
হার্মিং বার্ড চলে গেলে সভাপতি বলেন, চলুন কাজ শুরু করি। আমাদের রিপোর্টারদের ফোনগুলো ধরা যাক ।
ফোন রিং হয় । সম্পাদক উটপাখি রিসিভার কানে তুলে বলেন, হ্য হ্যা, শুনছি, কি বললে? শালিকপক্ষ শ্যাজানদের ওপর নুড়ি ছুড়েছে? অ্যাঁ বলো কি... শ্যাজানদের গায়ে লেগেছে... অ্যাঁ... কি বললে.. একজন বেসামরিক শ্যাজানের গায়েও লেগেছে!
সম্পাদক ফোন রেখে উপস্থিত ডেস্ক রিপোর্টারদের ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বলে, সবই তো শুনলে সবাই, তাহলে, খবরটা এভাবে লেখো, পূর্ব সীমান্তে শ্যাজানদের ওপর শালিকদের ন্যাক্কারজনক হামলা । এত নগ্ন হামলা যে, শ্যাজানদের একজন বেসামরিক পাখিনাগরিক এই হামলায় আহত হয়েছেন । এই অপাখবিক, নৃশংস, পঙ্গিবাদী হামলায় বিশ্বের সচেতন মহল উদ্বেগ জানিয়েছে । মহামান্য ঈগলের দপ্তরের সচিব জানিয়েছেন, শান্তির অগ্রদূত শ্যাজানদের ওপর এই হামলা শালিকদের উস্কানি হিসেবে ধরা হবে । এবং উস্কানিদাতাদের সমুচিত জবাবও দেয়া হবে ।
পাশাপাশি অবৈধ শালিকদের সমগ্র এলাকা থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে শ্যাজানদের কে ন্যায়সঙ্গত অধিকার দেয়ার বিষয়টিকেও আমরা বিবেচনা করছি ।
সভাপতি বাজপাখি বলে ওঠে,
চমৎকার, উটপাখি, তোমার প্রগ্রেস আমার নজর কাড়ছে ।
সম্পাদক উটপাখি বিগলিত ভঙ্গিতে হাসে ।
এদিকে লিখতে লিখতে আরেকটা ফোন আসে । সম্পাদক উটপাখি ফোন ধরে বলে, অ্যাঁ.... কি বললে, শ্যাজানরা গুলি ছুঁড়েছিল, অ্যাঁ.... কি বললে, শালিকদের নিজেদের খাবার বাগানে তাদের ঢুকতে দেয় নি প্রথমে, অ্যাঁ, ঢুকতে গেলে ধরে নিয়ে গেছে, তারপর তারপর..
উটপাখি ফোনের অপর পাশের কথা শোনে আর ঘসঘস করে টুকে নেয় । বাকি সবাই কান খাড়া করে শোনে সব ।
হুঁ হুঁ, কি বললে? অ্যাঁ.. আবার বল.. তারপর? শালিকরা প্রতিবাদ জানাতে গেলে গুলি ছুঁড়েছে, অ্যাঁ..মারা গেছে.... কি বললে?... শিশু শালিকও মারা গেছে? অ্যাঁ... প্রেফতারও করেছে? আচ্ছা আচ্ছা, নেক্সট আপডেট জানিও ইমিডিয়েটলি । হুঁ । খট করে উটপাখি ফোন নামিয়ে রাখে ।
তা এবার, উটপাখি মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ভাবে, তা এবার, বুঝলেন স্যার, সভাপতি বাজ মহাশয়ের দিকে তাকিয়ে উটপাখি বলে, এবার তাহলে, হঠাৎ উটপাখির মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, রিপোর্টারদের তাড়া দিয়ে বলে, ওহে ছোকরারা লেখো এভাবে,
পূর্ব সীমান্তে শ্যাজানদের ওপর শালিকদের অতর্কিত আক্রমন । আত্মরক্ষার্থে শ্যাজান বাহিনীর প্রতিরোধ । এ সংঘর্ষে উভয়পক্ষে ক্ষয়ক্ষতি এখনো জানা যায় নি ।
জানা গেছে, হঠাৎ অযৌক্তিক ভাবে শালিকরা একটি বাগানকে নিজেদের বলে দাবি করতে থাকে, সেখান থেকে ঘটনার সূত্রপাত । এ ঘটনায় আরো একবার প্রমাণিত হলো, শালিকরা উগ্রবাদী, শান্তিপ্রিয় শ্যাজানদের অধিকৃত জায়গায় তাদের দাবির বিষয়ে বৈশ্বিক যে আলোচনা চলছে, সেটিও থেমে দেয়া উচিত বলে সচেতন মহল মনে করে ।
মিনমিনে জুনিয়র অফিসার কিংফিশার সদ্য জয়েন করেছে । অনেক কিছুই বোঝে না । সে ভয়ে ভয়ে বললো, স্যার, শ্যাজানরা গুলি চালিয়েছে যে, সিভিলিয়ান পাখি তো বটেই, এমনকি শিশু শালিকও মারা গেছে, তা শ্যাজানদের এই গুলি চালানোকে কি পঙ্গিবাদী বা অপাখবিক হামলা বলে অভিহিত করব রিপোর্টে ?
সভাপতি বাজপাখি, সম্পাদক উটপাখি আর সদস্য সচিল সি-গাল একযোগে হেসে ওঠে ।
সি- গাল সিনিয়র রিপোর্টারকে বলে,
কি হে কুইটজেল, ওকে ঠিকঠাক শিখিয়ে পড়িয়ে নাও নি?
সভাপতি বাজপাখি আরামকেদারায় গা ডুবিয়ে বলে, শোনো কিংফিশার, পাখবতাবাদ, পঙ্গিবাদ এগুলো ব্যবহার করার সময়, কার জন্য ব্যবহার করছো সেটা খেয়াল রাখাটাই চালু নীতি । শালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা গেলে তখন এই শব্দগুলো আনবে । আর শব্দগুলো শ্যাজানদের বিরুদ্ধে গেলে রিপোর্টে এইসব শব্দ রাখবেই না । ক্লিয়ার?
কিংফিশার মাথা নাড়ে ।
'নিখিল বিশ্ব পাখিসব ' ভবনের বাইরে ঠিক তখন এক পশলা বাতাস বয়ে যায়, হু হু হু করে বয়ে যায় । সে বাতাসে শাখা নাড়িয়ে গাছেরা ফেলে দীর্ঘশ্বাস । অবারিত আকাশের নিচে ।
~ পরিব্রাজক